Religion factor’ in government service

Lately, many skilled, meritorious and conscientious government officials have been heard to lament, “Brother, I am in big trouble because of the ‘religion factor’.” I have worked with a reputation all my life, I have never had a little ‘spot’ anywhere in my career, but the promotion has been stuck for five years without any reason. There are a few more days of work, it seems, without promotion, the masters will hold the ‘pencil’ in their hands. I never lobbied for a good posting, I went where the government sent me like blindfolded bulls.

LIKE OUR FACEBOOK PAGE

Let it be Monpura-Bhurungamari, and let it be Naikhyangchhari-Khagrachhari. Why lobby? On the day I joined the job, I handed over the call to the government, I accepted that they will send me wherever they want in their needs, in the needs of the country, I will fulfill the responsibility given by them, knowing Allah to be present. My job is to fulfill my responsibilities with honesty and devotion, to serve the country, to serve the people.

 

সরকারি চাকরিতে ‘মজহাব ফ্যাক্টর

 
ন্টসরকারি চাকরিতে ‘মজহাব ফ্যাক্টর’
 

ইদানীং অনেক দক্ষ, মেধাবী ও বিবেকসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তাকে আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়, ভাই, ‘মজহাব ফ্যাক্টর’-এর কারণে বড় কষ্টে আছি। সারা জীবন সুনামের সঙ্গে চাকরি করলাম, কোনো দিন সামান্য একটু ‘স্পট’ পড়েনি ক্যারিয়ারের কোথাও, অথচ বিনা কারণে প্রমোশনটা আটকে আছে আজ পাঁচ বছর ধরে। চাকরির আর কয়দিনই বা আছে, মনে হচ্ছে, বিনা প্রমোশনেই হুজুররা ‘পেন্সিল’ ধরিয়ে দেবেন হাতে। কোনো দিন একটা ভালো পোস্টিংয়ের জন্য তদবির করলাম না, সরকার যেখানে পাঠিয়েছে সেখানেই চলে গেছি চোখ বাঁধা কলুর বলদের মতো। তা সেটা মনপুরা-ভূরুঙ্গামারীই হোক, আর নাইক্ষ্যংছড়ি-খাগড়াছড়িই হোক। তদবির করব কেন? চাকরিতে যেদিন জয়েন করেছি সেদিনই তো কল্লাটা সঁপে দিয়েছি সরকারের কাছে, মেনে নিয়েছি তারা তাদের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে যেখানে খুশি পাঠাবে, যে দায়িত্ব দেবে সেটাই পালন করব আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে। আমার কাজ হচ্ছে, আমার সবটুকু যোগ্যতা দিয়ে সততার সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব, দেশের সেবা করব, জনগণের সেবা করব। সরকার নিশ্চয়ই আমার কাজের মূল্যায়ন করবে, যখন যে দায়িত্ব আমাকে দেওয়া দরকার তাই দেবে। সময়মতো প্রমোশন-ট্রমোশন দেবে আমার সততা, দক্ষতা, কর্মকুশলতা এবং আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে আমার সফলতা-ব্যর্থতা ইত্যাদি বিবেচনা করে। চাকরিতে যোগদানের পর আমাদের ট্রেনিংয়ের সময় এসব কথামালা দিয়েই তো আমাদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে অষ্টপ্রহর। আর এগুলোকে তাবিজ করেই পাড়ি দিলাম সিকি শতাব্দী, সব রকম লোভ-লালসা, অন্যায় আচরণের টুঁটি টিপে ধরে। এই বুঝি তার প্রতিদান?

এতটুকু শোনার পর যখন জানতে চাইলাম এর কারণটা কী মনে করে সে, তখন বলল, ওই যে শুরুতেই বললাম ‘মজহাব ফ্যাক্টর’, ওটাই কারণ। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করতে বলায় বলল, সরকারি চাকরিতে এরশাদ আমলের পর থেকে নাকি ঈমান-আকিদা পরীক্ষার আসল মাপকাঠি হচ্ছে মজহাব। তুমি শুধু একজন খাঁটি মুসলমান হলেই হবে না, তোমাকে কর্তাব্যক্তিদের মজহাবের একজন হতে হবে। এমনকি তুমি মুসলমান না হলেও আপত্তি নেই, মজহাব ঠিক থাকলেই হবে। তবে মজহাব নাকি ইসলাম ধর্মের হানাফি, মালিকি, শাফায়ই, হাম্বলি মজহাব নয়—এটা বাংলাদেশের রাজনীতির মজহাব। জানতে চাইলাম, তা কার কোন মজহাব সেটা বোঝা যাবে কী করে? ‘কেন, ডিএনএ টেস্ট করে,’ সে ফটাফট জবাব দিল। যখন হাঁদা গঙ্গারামের মতো জানালাম, জিনিসটা এখনো ক্লিয়ার হয়নি আমার কাছে, তখন সে বুঝিয়ে বলল, ডিএনএ টেস্ট হচ্ছে, তুমি কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক, হৃদয়ে কোন দলের আদর্শ লালন করো, সেই দলের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তুমি কোনো ভূমিকা পালন করো কি না এইসব। ডিএনএ টেস্ট করে এগুলো জানা যায়। এখন যদি তোমার কোনো প্রকার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, পরিচয় বা জাহিরি-বাতিনি সমর্থন না থাকে, অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে তুমি যদি হও একটা ভেজিটেবল, তাহলে ছাত্রজীবনে কোন দল করতে, তোমার ভাই-বোন, বাপ-চাচা-দাদা-নানা-মামা গং তস্য গং কোন দল করেন বা করতেন এসব তথ্য গোয়েন্দা বাহিনী লাগিয়ে, ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে, গুগল ঘেঁটে, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সব আমলের নথিপত্র-রেকর্ড রুম-আর্কাইভ ইত্যাদি তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করার নাম প্রশাসনিক ডিএনএ টেস্ট। ওই খোঁজাখুঁজির ভিত্তিতে নির্ণয় করা হবে তুমি কোন মজহাবের লোক। যদি তুমি আমাদের মজহাবের লোক হও তাহলে তোমার নথির ওপর অদৃশ্য কালির সিল মারা হবে : ‘আমাদের লোক’। আলহামদুলিল্লাহ, চাকরিতে তোমার তরক্কির নৌকা সব সময় তরতর করে শুকনো দিয়েও চলবে। আর যদি তোমার বোনের শ্বশুরের চাচাতো শালার সম্বন্ধীর পাশের বাড়ির লোকও আমাদের চক্ষুশূল পার্টির সমর্থক হয়, তাহলে তোমার কপালে শুধু দুঃখ না, ইহজনমের মতো দুর্ভোগ লেখা হয়ে যাবে। তোমাকে চাকরিজীবনে এমন গভীর খাদে ফেলা হবে যে আইডাব্লিউটিএর সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রেন দিয়েও তোমাকে টেনে তোলা যাবে না। এটাই হলো মজহাব ফ্যাক্টর, যার একমাত্র মানদণ্ড বা নির্ণায়ক হচ্ছে আনুগত্য। হ্যাঁ, আনুগত্য। আনুগত্য আমার প্রতি, আমার দল ও দলের নেতৃবৃন্দের প্রতি!

ভালো কথা, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় যেসব সবক তোমার অস্থিমজ্জায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার প্রথমটিও ছিল আনুগত্য, তবে সে আনুগত্য রাষ্ট্রের প্রতি, রাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি, জনগণের প্রতি—কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের প্রতি নয়। সর্বোপরি শেকসপিয়ারের হ্যামলেট নাটকের বৃদ্ধ মন্ত্রী পলোনিয়াস তাঁর পুত্র লাইয়ারটিসকে যে উপদেশামৃত দিয়েছিলেন—টু দাইন অউন সেলফ বি ট্রু (তোমার নিজের বিবেকের প্রতি বিশ্বস্ত থেকো) এবং তা যে সব সময় স্মরণ রাখতে বলেছিলেন তোমার গুরুজনেরা, সেটা কর্তাদের মাইনকা চিপায় পড়ে কবেই ভুলে গেছ তুমি। আনুগত্য, ন্যায়নীতি, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠার সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে যুগের হাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে। সব সরকারই মনে করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের অর্থাৎ রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তারা তাদের কর্মচারী।

স্বাধীনতার পর দেশটাকে নিজেদের মুঠোর মধ্যে পেয়ে বাঙালি দেখাতে শুরু করল কী করে পশ্চিমাদের কাছ থেকে অধীত বিদ্যা প্রয়োগ করে দুর্নীতিতে দ্রুত পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। আর তাতে ‘জয়েন্ট কোলাবরেশনে’ অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করল রাজনীতি ও প্রশাসনের কতিপয় সুযোগসন্ধানী ফটকাবাজ। তারপর? তারপর সেই ট্র্যাডিশন সমানেই চলছে। স্বৈরাচার আমলে দুর্নীতির মডেল ছিল : উন্নয়নের মায়া অঞ্জন জনগণের চোখে লাগিয়ে তলে তলে আখের গোছাও। এরপর যখন গণতন্ত্রের লেবাস পরল এই দেশ, তখন সংশ্লিষ্টদের সাহস গেল বেড়ে : আর ‘তলে তলে’ নয়, এবার সিনা ফুলিয়ে, আজান দিয়ে চলল দুর্নীতির মহোৎসব। আর এতে প্রযোজক-পরিচালক, শিল্পী-কলাকুশলী যথারীতি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও তাঁদের কিছু কিছু বিশ্বস্ত দোসর আমলা, যে আমলারা জানে সব আমলে কী করে রোদ উঠলেই খড় শুকাতে হয়। স্বাধীনতার আগে বা পরে কখনোই দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও আমলাদের এমন মণিকাঞ্চনযোগ আর কখনো ঘটেনি। মুখে দেশোদ্ধারের বড় বড় বুলি কপচিয়ে এরা আসলে ‘তু অর্দ্ধং মু অর্দ্ধং’য়ের ভাগ-বাটোয়ারার নীতিই নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে যেতে লাগল। বলা যেতে পারে, এটা এক ধরনের পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ), যা প্রতিষ্ঠিত হলো কতিপয় দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও আমলা-প্রফেশনালদের (প্রকৌশলী, চিকিৎসক ইত্যাদি কে নয়, কেবল সুযোগ পেলেই হলো) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক যোগসাজশের ওপর ভিত্তি করে।

সামগ্রিকভাবে প্রশাসনের এই যে অবক্ষয় এটা কিন্তু গত এক-দুই দশকে ঘটেনি; একটু খতিয়ে দেখলেই দেখা যাবে অবক্ষয়ের ঘুণপোকা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ঢুকে পড়ে স্বাধীনতার পরে পরেই। আর কৌশল হিসেবে সে বেছে নেয় বিদ্বেষ, বিভাজন ও সন্দেহের মতো আত্মঘাতী মারণাস্ত্রগুলোকে। তখন কে সীমান্ত পার হয়ে মুজিবনগর সরকারের খাতায় নাম লিখিয়েছিল, কে ওপারে না গিয়ে পাকিদের চাকরি করে ‘কোলাবরেটর’ সেজে দালালি করেছে, কে পিন্ডি-ইসলামাবাদ-পেশোয়ারে বৌ-বাচ্চাসহ পাকিদের ‘মেহমানদারি’ উপভোগ করেছে, কে কলকাতায় গিয়ে চার মিনার সিগ্রেট ফুঁকতে ফুঁকতে ভারতের দালাল বনে গেছে ইত্যাদি নানা ধরনের লেবেল লাগানো হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শার্টের পেছনে। এর তাত্ক্ষণিক আসর পড়ল সরকারি কর্মকাণ্ডে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারস্পরিক সম্পর্কে দেখা দিল সন্দেহ-বিদ্বেষ, যার ফলে গোটা প্রশাসনে ছড়িয়ে পড়ল এক ধরনের অঘোষিত অসন্তোষ, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিভাজন। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে, বিশেষ করে যেখানে রাষ্ট্রপর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা বলতে গেলে কারোই ছিল না—না আমলাদের, না রাজনীতিবিদদের—সেখানে এই ধরনের অসন্তোষ ও বিভাজন ছিল রীতিমতো অন্তর্ঘাতমূলক।

আরেকটি নতুন অভিজ্ঞতা এ দেশের আমলা-কামলাদের দারুণভাবে আন্দোলিত করল। তা হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয়দের—এককথায় মন্ত্রী-এমপিদের সান্নিধ্য। আগে যেখানে একজন নীতিনির্ধারক নেতার দেখা পেতে ছুটতে হতো পিন্ডি-ইসলামাবাদে, এখন তাঁরা আমাদের একেবারে কাছের মানুষ—অমুক ভাই, না হয় তমুক চাচা, মামা। তাঁদের সহবতে এসে সরকারি আমলা-কামলারা অতি দ্রুতই ‘পলিটিসাইজড’ হয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত নৈর্ব্যক্তিকতা—‘ফেসলেসনেস অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’—হারাতে লাগল প্রশাসন। অথচ আবহমানকাল ধরে ওটাই ছিল আমলাদের গৌরবের ধন, যার ওপর আস্থা ছিল বলে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই সেদিনও জেলা প্রশাসককে গ্রামের একজন হতদরিদ্র মানুষও ‘হুজুর মাই-বাপ’ বলে জানত। বড়ই কষ্ট পাই যখন শুনি সেই মানুষটির আস্থায় চিড় ধরেছে। কারণ এখন সে জানে অমুক রাজনৈতিক ভাই বা তমুক হুজুরই হচ্ছেন আসল কামেল দরবেশ, যার সুপারিশ ছাড়া তার ‘হুজুর মাই-বাপ’ কিছু করবেন না। অবশ্য জেলা প্রশাসক মহোদয় যদি ‘আমাদের মজহাবের লোক’ হন, তাহলে হয়তো কোনো ভাই বা চাচা না ধরলেও চলবে, তিনি নিজেই মাশাল্লাহ সব দিক সামাল দিতে পারবেন।

২.

১৯৭০ ও আশির দশকে তিনটি বৃহত্তর জেলা ও একটি বিভাগ এবং তার আগে পাক আমলে যখন ‘নাপাক’ লোকেরা দেশ শাসন করত, তখন তিনটি মহকুমায়, প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেছি আমি। আশির দশক মানে স্বৈরাচার আমল বলে যে আমলকে উঠতে-বসতে আমরা গালমন্দ করি সেই আমল, যার যবনিকাপাত হয় ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে। তখন মাঠ প্রশাসন বা উঁচু স্তরে কোথাও ক্বচিৎ অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কথা শোনা যেত। আমার কথা বিশ্বাস না করলে ওই সব আমলে যাঁরা সরকারি চাকরি করতেন তাঁদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। তেমনি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো মন্ত্রী-মিনিস্টার-এমপির তোষামোদি করে চাকরি করেন—এমনটাও শোনা যেত না। পাক আমলেই নওয়াব বাহাদুর, খান বাহাদুর, রায় বাহাদুর প্রভৃতি বাহাদুরদের বাহাদুরি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জমিদারদের জমিও কেড়ে নিয়ে সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করেছিল দেশভাগের পরে পরেই। ফলে সরকার-বেসরকারের এসব উটকো ঝামেলামুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নিজের বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভর করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে বা দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে নিজেকে নিয়োজিত করতে কোনো বাধা ছিল না আমাদের। যার ফলে দিনশেষে অর্থবিত্ত না-ই জুটুক একটা অপার্থিব মানসিক প্রশান্তি ও অনির্বচনীয় আনন্দ নিয়ে ঘুমুতে পেরেছি আমরা।

এই তদবিরবিহীন আইন-কানুননির্ভর প্রশাসন আমরা পেয়েছিলাম ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটা কথা চাউর হয়েছিল সেই সত্তরের দশকে : ব্রিটিশরা করত শাসন, পাকিস্তানিরা করেছে শোষণ আর এখন চলছে ভাষণ-তোষণ। ব্রিটিশ আমলের আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস)-এর, যাকে বলা হতো স্টিল ফ্রেম অব ব্যুরোক্রেসির অনুকরণে পাকিস্তানে গড়ে তোলা হয় সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান)। এর অনেক সদস্যই বাদামি সাহেব বনে যাওয়ায় পাবলিকের কাছে এঁরা দূর গগনের শশীই থেকে যান, তবে তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনে এঁদের সহযোগী ছিলেন ইপিসিএস (ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস)-এর অফিসাররা। এঁরাও যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতেন। তখন একজন কর্মকর্তার পদায়ন-পদোন্নতি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করত তাঁর মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সর্বোপরি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর। ‘আমি যেভাবে খুশি কাজকর্ম করি, পয়সা বানাই,/আমার আছেন অমুক ভাই, আমার কোনো চিন্তা নাই,/পছন্দসই পোস্টিং আর সময়মত প্রমোশন পাই’—এ ধরনের বদখেয়াল প্রাক-স্বাধীনতা আমলে শুধু জনপ্রশাসন নয়, অন্য কোনো সার্ভিসের সদস্যদের মধ্যেও বড় একটা দেখা যেত না। যাই হোক, জনস্বার্থে, বিশেষ করে একটি উন্নয়নশীল দেশে একটি সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মীবাহিনীর অপরিহার্যতা বিবেচনা করে বিষয়টিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় কিন্তু চলে যাচ্ছে। তা না হলে নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাংকেনস্টাইনের হাতে নিজেদেরই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হবে, ঘটবে। আর দেশের মানুষ কোন দিন জানি একযোগে সবাই মিলে সুইসাইড খেয়ে গিনেস বুকে নাম লেখাবে।

আমাদের প্রশাসনের অধোগতি শুরু হয় স্বাধীনতার পরপরই, সে কথা আগেই বলেছি। আর এর ষোলোকলা পূর্ণ হয় ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চে। সেটা ছিল প্রশাসনে রাজনৈতিক রং চড়ানোর চূড়ান্ত রূপ। এর যৌক্তিকতা-অযৌক্তিকতা ভালো-মন্দ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় গিয়ে নতুন করে কোনো বিতর্কের জন্ম দেবো না, তবে এটা যে প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ পরিপন্থী একটা পদক্ষেপ ছিল তা অনস্বীকার্য। যে সচিবালয় জনপ্রশাসনের সর্বোচ্চ ও সর্বজনস্বীকৃত পাদপীঠ, তার সব রকমের নিয়ম-কানুন-ঐতিহ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আমতলার মিটিংয়ের মতো মিটিং করবেন ও তাঁদের নেতা রাজনৈতিক নেতাদের মতো (নাকি যাত্রাদলের অধিকারীর মতো?) গলায় চাদর ঝুলিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা করবেন, তারপর মিছিল নিয়ে বের হবেন রাজপথে, এটা নিশ্চয়ই যেকোনো দেশের জনপ্রশাসনের অপমৃত্যু ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। শুধু এখানেই শেষ নয়, সচিবালয় থেকে এক শ হাত দূরে মঞ্চ বানিয়ে অহোরাত্র সংকীর্তনের মতো বক্তৃতা-বিবৃতি ঝাড়তে থাকলেন ওই সব নেতা ও তাঁদের দ্বারা আমন্ত্রিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এরপর কেউ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি মেনে চলবে, এটা আশা করা যায় না। সেই মঞ্চের নাটক শেষ হতে না হতেই দেখা গেল এর পরিচালক ও অন্য নটবররা আশাতীত পুরস্কার লাভ করলেন। কেউ কেউ অচিরেই মন্ত্রী-মিনিস্টারও হয়ে গেলেন। আর সবই হলো বেচারা প্রশাসনের শতাব্দীপ্রাচীন গর্বের ধর্মনিরপেক্ষতা, নৈর্ব্যক্তিকতা ও আইনানুগতার বিনিময়ে। মেসেজ চলে গেল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সবখানে : আখের যদি গোছাতে চাও তবে কর্তাভজা হও, সব সময় মনে রাখবে ‘বস ইজ অলওয়েজ রাইট, ইভেন হোয়েন হি ইজ রং’। এভাবেই সরকারি, আধাসরকারি, নিম সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ইত্যাদি সবাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের মতো আপন আপন দল গঠন করে কেউ সরকারের পায়বন্দি, কেউ বিরুদ্ধাচরণ করতে শুরু করল। কর্তাভজাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ দেখে যে কারো মনে হবে তারা ‘মোর লয়াল টু দ্য থ্রোন দ্যান দ্য কুইন হারসেলফ’। ফল দাঁড়াল এই : মজহাব ফ্যাক্টরের কারণে যোগ্যতা-দক্ষতা-সততাকে গুলি মেরে অনেক তেলবাজ অদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী ভালো ভালো পদে অধিষ্ঠিত হলো, প্রমোশন পেল, আর তাদেরই অনেক মেধাবী, দক্ষ ও সৎ সহকর্মীর যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হলো দেশ।

তাহলে কী করতে হবে? সর্বপ্রথম আমি মনে করি, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী ইত্যাদি প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাঁরা জনসেবার দায়িত্বকে পাশে ঠেলে লাল-নীল-সাদা, স্বাধীনতা-পরাধীনতা ইত্যাদি সংগঠনের ছদ্মাবরণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছেন তাঁদের নিরুৎসাহ করতে হবে।…

৩.

  1. নিয়মিত চাকরির আপডেট পেতে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এ পর্যন্ত যখন লিখেছি তখন খবর পেলাম একটি দুই নম্বরি হাসপাতালের মালিক একজন সুপার চালাক ফোর টোয়েন্টি প্রতারক ধরা পড়েছেন। জাতি আসলে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কখন তাঁর গ্রেপ্তারের সংবাদ শুনবে। এই সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানাই মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আমাদের অত্যন্ত দক্ষ, স্মার্ট র‌্যাব বাহিনীকে। এখন প্রতীক্ষায় থাকব কত দ্রুত নেপথ্যের রুই-কাতলারা ধরা পড়ে এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়। রাঘব বোয়ালরা যেন জাল ছিঁড়ে বের না হয়ে যায় কিংবা তাদের ধরতে যেন কারো হাত না কাঁপে সেটাই প্রত্যাশা।

Check Also

Corona’s second push is not a holiday or a lockdown

Even if the incidence of corona increases in the coming winter, the country will not …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *